মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে? স্বপ্নের রহস্য: বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে- আজকের বিকেলের কথাই বলি। চা খেতে খেতে হুট করে মনে পড়লো গত রাতের একটা বিচিত্র স্বপ্নের কথা। একটা অচেনা ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ আশেপাশের মানুষগুলোকে খুব পরিচিত লাগছে। ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে কেমন যেন দিশেহারা লাগলো। আমাদের সাথে প্রায়ই এমন হয়, তাই না? বালিশ থেকে মাথা তোলার পর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ভাবি—আচ্ছা, মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে?
ছোটবেলা থেকেই এই প্রশ্নটা আমাকে বেশ তাড়া করতো। দাদি-নানিরা বলতেন, সারাদিন যা ভাবো রাতে সেটাই স্বপ্নে আসে। কিন্তু বড় হয়ে যখন নানা বইপত্র আর বিজ্ঞানীদের গবেষণার পেছনে একটু চোখ বোলালাম, দেখলাম ব্যাপারটা অতটাও সোজা নয়। আমাদের রাতের এই রঙিন বা কখনো অদ্ভুত দৃশ্যপটগুলোর পেছনে বেশ জটিল কিছু খেলা লুকিয়ে আছে।
আজ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক টেক্সটবইয়ের শুকনো ভাষায় নয়, একদম আড্ডার ছলে একটু খোঁজার চেষ্টা করি এই রহস্যের আসল উত্তরগুলো।
সারাদিনের অভিজ্ঞতার এক জটপাকানো রিহার্সাল
আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কত কী যে দেখি, শুনি আর অনুভব করি—তার হিসাব রাখা কঠিন। অফিস বা কলেজের কাজ, রাস্তায় দেখা হওয়া পরিচিত অচেনা চোখ, ট্রাফিকের ক্লান্তি, এমনকি হঠাৎ শোনা কোনো পুরানো গান—সব আমাদের মস্তিষ্কে জমতে থাকে।
বিজ্ঞানীদের বড় একটা দলের মতে, মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে—এই প্রশ্নের সহজ একটা উত্তর হলো স্মৃতি প্রসেসিং। সহজ কথায়, সারাদিনের জমতে থাকা বিশৃঙ্খলাগুলোকে মাথা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ঘুমন্ত অবস্থায় ব্রেন সিদ্ধান্ত নেয় কোনটা দরকারি ফাইল আর কোনটা এক কোণে ফেলে রাখার মতো ট্র্যাশ। এই গোছগাছের সময় আমাদের অবচেতন মন কিছু এলোমেলো দৃশ্য তৈরি করে ফেলে, যা আমরা স্বপ্ন হিসেবে দেখি।
আবেগ আর জমানো অনুভূতির আয়না
অনেক সময় দেখা যায় স্বপ্নে এমন কিছু ঘটছে যার সাথে কোনো বাস্তব যুক্তির মিল নেই, কিন্তু অনুভূতির বেশ গভীর মিল আছে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু বলছিল, সে নাকি বারবার দেখছে একটা উঁচু পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেল, চাকরি নিয়ে সে ইদানীং প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ভুগছে।
আসলে, মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে তা বোঝার জন্য আমাদের মনের ভেতরের না-বলা কথাগুলো বোঝা খুব দরকার। সারা দিন আমরা যেসব ভয়, রাগ বা মন খারাপ লুকিয়ে রাখি, ঘুমানোর সময় আমাদের অবচেতন মন সেগুলোকে বাইরে বের হতে দেয়। এক অর্থে, স্বপ্ন হলো একধরনের থেরাপি। সারাদিনের জমানো মানসিক চাপকে শরীর এভাবে হালকা করে নেয়।
ঘুমের ‘রেম’ বা REM ফেইজের জাদু
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমাদের ঘুমের কয়েকটি ধাপ থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ বা REM sleep। আপনি যদি ঘুমন্ত কারো চোখের দিকে তাকান, দেখবেন চোখের পাতা বন্ধ থাকলেও চোখের মণিগুলো খুব দ্রুত নড়ছে। ঠিক এই ধাপটিতেই সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর অদ্ভুত সব স্বপ্নগুলো তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই সময়ে মস্তিষ্কের আবেগ সংক্রান্ত অংশগুলো (যেমন অ্যামিগডালা) বেশ সক্রিয় থাকে, কিন্তু যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির অংশটি একদম ঘুমিয়ে পড়ে। আর ঠিক এই কারণেই স্বপ্নে যখন আমরা আকাশে উড়ি বা হঠাৎ কোনো অদ্ভুত প্রাণীর সামনে পড়ি, তখন কিন্তু সেটাকে অসম্ভব মনে হয় না! ঘুমের এই বিশেষ ধাপে ব্রেনের কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদে জানতে Sleep Foundation-এর এই গবেষণা মূলক লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন, বেশ আগ্রহোদ্দীপক তথ্য রয়েছে সেখানে।
ভয়ের স্বপ্ন আর টিকে থাকার আদিম লড়াই
মাঝে মাঝে তো এমন সব দুঃস্বপ্ন দেখি যে বুক ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে যায়। ঘামে ভিজে যায় শরীর। বিজ্ঞান কিন্তু এই দুঃস্বপ্ন দেখার পেছনেও একটা চমৎকার কারণ দাঁড় করিয়েছে। একে বলা হয় ‘থ্রেট সিমুলেশন থিওরি’।
আদিমকাল থেকেই মানুষের মস্তিষ্ক বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে। স্বপ্নে বিপদ বা ভয়ের মুখোমুখি হয়ে আমাদের মন আসলে বাস্তব জীবনের যেকোনো সম্ভাব্য বিপদের আগাম মহড়া দিয়ে নেয়। অর্থাৎ, মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে—তার পেছনের একটা কারণ হলো আমাদের অবচেতন মনকে যেকোনো অচেনা পরিস্থিতিতে ভয় মোকাবিলা করতে শেখানো।
তবে কি সব স্বপ্নেরই নির্দিষ্ট কোনো মানে আছে?
অনেকেই স্বপ্নে একটা নির্দিষ্ট জিনিস দেখে গুগল করা শুরু করেন—’স্বপ্নে সাপ দেখলে কী হয়’ কিংবা ‘উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়ার অর্থ কী’। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, কোনো বই বা অনলাইন গাইড কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত জীবনের অনুভূতি পুরোপুরি বুঝতে পারবে না।
মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড কিন্তু মনে করতেন স্বপ্নের পেছনে অনেক গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা নিউরোসাইন্সের অনেকেই বলেন, সব স্বপ্নের কোনো গভীর গূঢ় অর্থ নাও থাকতে পারে। অনেক সময় এটা মস্তিষ্কের নিছক কিছু অপ্রয়োজনীয় সংকেত ছড়ানোর ফলাফল মাত্র। ব্রেন আর স্বপ্নের এই অদ্ভুত যোগসূত্র সম্পর্কে চমৎকার কিছু তথ্য পাবেন Scientific American-এর এই নিবন্ধে।
দিনশেষে, মানুষ স্বপ্ন কেন দেখে—এই রহস্যের শতভাগ সমাধান আজও কোনো বিজ্ঞানী পুরোপুরি করতে পারেননি। আর সত্যি বলতে, এই কিছুটা অস্পষ্টতা আছে বলেই বোধহয় রাতের এই জগতটা এত সুন্দর আর রহস্যময়।
কখনো এটা আমাদের খুব কাছের কোনো মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, কখনো কোনো জটিল সমস্যার সমাধান এনে দেয়, আবার কখনো শুধুই সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু হেসে ফেলার অজুহাত তৈরি করে। আপনি শেষ কোন অদ্ভুত স্বপ্নটা দেখে চমকে উঠেছিলেন? চাইলে বন্ধুদের সাথে চা আড্ডায় কথাটা তুলে দেখতে পারেন, দেখবেন সবার কাছেই বলার মতো চমৎকার কিছু গল্প জমানো আছে!

