Scienceমানবদেহ ও জীববিজ্ঞান

মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কে ২০টি অবাক করা তথ্য

 রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভালো খাবার অর্ডার করা, প্রেমে পড়া, মাঝরাতে অহেতুক পুরোনো কোনো স্মৃতির কথা ভেবে মন খারাপ করা—সবকিছুর পেছনেই কিন্তু বসে আছে এই একটা জিনিস। কথা বলছি মানব মস্তিষ্ক নিয়ে।
বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, এই অঙ্গটা নিয়ে আমাদের অবাক হওয়ার পরিধিও তত বাড়ছে। চলুন আজ কোনো টেক্সটবইয়ের মতো নীরস ভাষায় নয়, বরং চায়ে চুমুক দিতে দিতে মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কিত ২০টি এমন তথ্য জেনে নিই, যা হয়তো আপনাকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

Table of Contents

১. শক্তির এক অদ্ভুত ভাণ্ডার

মানব মস্তিষ্ক দেহের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশের মতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমাদের শরীরের মোট অক্সিজেন আর গ্লুকোজের প্রায় ২০ শতাংশ একা এই অঙ্গটাই খরচ করে ফেলে। ভাবা যায়?

২. বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা

আপনার মাথার ভেতরের মানব মস্তিষ্ক দিনে যে পরিমাণ বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে, তা দিয়ে ছোটখাটো একটা ১২ ওয়াটের এলইডি বাল্ব অনায়াসে জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব!

৩. ব্যথার অনুভূতি কিন্তু এটার নিজের নেই

মাথাব্যথা হলে আমরা ভাবি মস্তিষ্ক বুঝি ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, মানব মস্তিষ্ক নিজে কখনো ব্যথা অনুভব করতে পারে না! কারণ এতে কোনো ব্যথাবেদন গ্রাহক বা পেইন রিসেপ্টর নেই। মাথার চারপাশের চামড়া, মাংসপেশি আর রক্তনালীর ব্যথাই আমরা টের পাই।

৪. তথ্যের এক অনন্ত মহাবিশ্ব

আপনার ফোনে ১২৮ বা ২৫৬ জিবি স্টোরেজ শেষ হয়ে গেলে দুশ্চিন্তা শুরু হয়, তাই না? কিন্তু মানব মস্তিষ্ক কত তথ্য জমা রাখতে পারে জানেন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যমতে, এর ধারণক্ষমতা প্রায় ২.৫ পেটাবাইট বা ২৫ লাখ গিগাবাইটের সমান!

৫. অনুভূতির নিজস্ব সুপারহাইওয়ে

মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে যখন কোনো চিন্তা বা নিউরনের সংকেত যাতায়াত করে, তার গতি থাকে ঘণ্টায় প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার। বুলেট ট্রেনের চেয়েও দ্রুত!

৬. জলছাপের মতো তরল

আমাদের মানব মস্তিষ্ক দেখতে বেশ শক্ত মনে হলেও, এর প্রায় ৭৫ শতাংশ অংশই আসলে পানি। তাই সামান্য পানিশূন্যতা বা ডিমেনশিয়া হলেও আমাদের মনযোগ দিতে কিংবা চিন্তা করতে বেশ কষ্ট হয়।

৭. চর্বিতে ভরপুর!

শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও সত্যি যে, মানব মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে চর্বিযুক্ত অঙ্গ। এর প্রায় ৬০ শতাংশ অংশই ফ্যাট বা চর্বি দিয়ে তৈরি।

৮. স্বপ্নের রহস্যময় ক্যানভাস

আমরা রাতে ঘুমানোর পর যে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখি, তার পেছনে কাজ করে মানব মস্তিষ্ক। ঘুমন্ত অবস্থায় যখন পুরো শরীর বিশ্রাম নেয়, তখনো এই অঙ্গটি জাগ্রত অবস্থার চেয়েও বেশি সক্রিয় থাকে।

৯. প্রতিদিন হাজার হাজার চিন্তার খেলা

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের মানব মস্তিষ্ক প্রতিদিন গড়ে ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ পর্যন্ত চিন্তা উৎপাদন করে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এর বেশিরভাগ চিন্তাই নেতিবাচক বা পুরোনো জিনিসের পুনরাবৃত্তি।

১০. ছোটবেলার কথা মনে না থাকার কারণ

আমাদের তিন বা চার বছর বয়সের আগের কথাগুলো কেন পরিষ্কার মনে থাকে না কখনো ভেবেছেন? একে বলে ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেসিয়া’। ওই বয়সে মানব মস্তিষ্ক এত দ্রুত বাড়ে যে, নতুন নিউরনের ভিড়ে পুরোনো স্মৃতিগুলো জমা রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা তখনো তৈরি হয় না।

১১. নিজের চেহারা নিজে বদলে ফেলার ক্ষমতা

মানব মস্তিষ্ক এমন এক অদ্ভুত গুণ ধারণ করে যাকে বলে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’। আপনি যখন নতুন কিছু শেখেন—তা হোক নতুন ভাষা বা গিটার বাজানো—তখন আপনার মানব মস্তিষ্ক নিজের নিউরনের গঠন বদলে ফেলে।

১২. তথ্য প্রক্রিয়াকরণের রাজত্ব

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী যে সুপারকম্পিউটার, তার চেয়েও অনেক দ্রুত আর সূক্ষ্মভাবে কাজ করে মানব মস্তিষ্ক। কারণ এটি একসঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন সিগন্যাল প্রসেস করতে পারে।

১৩. ব্যথা কমানোর অদ্ভুত ক্ষমতা

কখনো খেয়াল করেছেন, হঠাৎ কোথাও চোট পেলে আমরা সেখানটা চেপে ধরি বা ডলে দিই? এর কারণ মানব মস্তিষ্ক একসঙ্গে কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যথার সংকেতই গ্রহণ করতে পারে। স্পর্শের অনুভূতি ব্যথার অনুভূতিকে কিছুটা আটকে দেয়।

১৪. অক্সিজেন ছাড়া বাঁচা কঠিন

মানব মস্তিষ্ক মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট অক্সিজেন না পেলে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এটি শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ।

১৫. শর্টকাট খোঁজার এক ওস্তাদ!

মানব মস্তিষ্ক খুব অলসভাবে কাজ বাঁচাতে ভালোবাসে। একে বলে হেউরিস্টিকস (Heuristics)। দৈনন্দিন নানা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মস্তিষ্ক সবসময় শর্টকাট নিয়ম খোঁজে যাতে শক্তি কম খরচ হয়।

১৬. নতুন নিউরন তৈরির ক্ষমতা

একসময় ভাবা হতো বয়স বাড়লে মানব মস্তিষ্ক নতুন করে আর কোনো নিউরন তৈরি করতে পারে না। কিন্তু আধুনিক নিউরোসাইন্স বলছে ভিন্ন কথা। আমরা বয়স বাড়লেও নতুন নিউরন তৈরি করতে পারি, যাকে বলে ‘নিউরোজেনেসিস’।

১৭. স্মৃতি ছাঁটাইয়ের কাজ

আমরা সারাদিন যা কিছু দেখি বা শুনি, তার সবকিছু কিন্তু মানব মস্তিষ্ক মনে রাখে না। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় তথ্যগুলো মুছে ফেলে আর দরকারি জিনিসগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে পাঠিয়ে দেয়।

১৮. এক অদ্ভুত বিভ্রমের জায়গা

কখনো কি মনে হয়েছে আপনি কোনো জায়গায় প্রথমবার গিয়েও মনে হচ্ছে জায়গাটা আগে থেকেই চেনেন? একে বলে ‘দেজা ভ্যু’ (Déjà vu)। মানব মস্তিষ্ক যখন স্মৃতি প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে সামান্য ভুল সমন্বয় করে, তখনই এই অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হয়। আরও বিস্তারিত জানার জন্য Scientific American-এর এই গবেষণা আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।

১৯. ক্লান্তি আসলে মাথার খেলা

শারীরিক খাটাখাটনির পর যে ক্লান্তি আসে, তার বড় অংশই তৈরি করে মানব মস্তিষ্ক। শরীরকে অতিরিক্ত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে মস্তিষ্ক আগেভাগেই সংকেত পাঠায়—”এবার একটু থামো, বিশ্রাম নাও।”

২০. প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া অঙ্গ

আপনি এই আর্টিকেলটি পড়া শুরু করার আগে আপনার মানব মস্তিষ্ক যেমন ছিল, পড়া শেষ করার পর তা ঠিক একরকম থাকবে না। পড়ার এই সামান্য সময়েও মস্তিষ্কে বেশ কিছু নতুন নিউরো-সংযোগ তৈরি হয়ে গেছে!
আমাদের মাথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই অর্গানটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গবেষণা চলছে। মানব মস্তিষ্ক সংক্রান্ত নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণার খবরাখবর জানতে Live Science Brain Section বেশ ভালো একটা উৎস হতে পারে।
দিনশেষে, আপনি এখন যা ভাবছেন বা অনুভব করছেন, তা এই জটিল জৈবিক যন্ত্রটারই উপহার। নিজের এই দারুণ অঙ্গটির যত্ন নিন—ঠিকমতো ঘুমান, পুষ্টিকর খাবার খান আর নতুন নতুন জিনিস শেখার মাধ্যমে একে সবসময় সচল রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *