Scienceমহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান

মহাবিশ্ব কত বড়? সহজ ভাষায় জানুন।

মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে আমরা কত দিনই না আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি, তাই না? রাতের শান্ত আকাশে হাজারটা তারা জ্বলতে দেখলে কারই বা মনে এই প্রশ্নটা জাগবে না—আসলে এই মহাবিশ্ব কত বড়?

ছোটবেলায় যখন ছাদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাতাম, মনে হতো ওই যে কিছু তারা দেখা যাচ্ছে, হয়তো আকাশটা ঠিক ওখানেই শেষ। কিন্তু একটু বড় হয়ে বিজ্ঞান জানতে শুরু করার পর বুঝতে পারলাম, আমাদের ভাবনার সীমানা যেখানে গিয়ে থামে, সেখান থেকেই যেন এর আসল রূপ শুরু হয়। সত্যি বলতে, মহাবিশ্ব কত বড় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে চামচ দিয়ে পানি মেপে দেখার মতো একটা বিষয়।

চলুন, কোনো কঠিন বৈজ্ঞানিক গ্যাংজ্যাম ছাড়া, একদম সহজ ভাষায় আর আড্ডার ছলে বিষয়টাকে একটু বোঝার চেষ্টা করি।

আমরা ঠিক মহাবিশ্ব এর কোথায় আছি? 

মহাবিশ্ব কত বড় সেটা বোঝার আগে আমাদের নিজস্ব ঠিকানাটা একটু চিনে নেওয়া ভালো। আমরা যে পৃথিবীতে আছি, সেটা আমাদের কাছে বেশ বড় মনে হতে পারে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতেই কত ঘণ্টার বিমান জার্নি লাগে! কিন্তু এই বিশাল পৃথিবীটা মহাবিশ্বের তুলনায় কতটুকু জানেন?

মহাকাশের স্কেলে চিন্তা করলে, পৃথিবীটা একটা বালুকণার চেয়েও ছোট। আমাদের সূর্যটা এমনই এক বিশাল নক্ষত্র, যার ভেতরে নাকি প্রায় ১৩ লাখ পৃথিবী এঁটে যাবে! আর আমাদের এই সূর্য আবার যে গ্যালাক্সিতে আছে—মানে ‘মিল্কিওয়ে’ বা ছায়াপথ—সেখানে সূর্যের মতো আর সূর্য থেকে অনেক বড় নক্ষত্র আছে শত শত কোটি। ভাবতেই কেমন জানি মাথায় চক্কর দিয়ে ওঠে, তাই না?

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা নিজেদের জীবনে যেসব ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে এত চিন্তিত থাকি, মহাবিশ্বের এই বিরাট ক্যানভাসে সেগুলোর অস্তিত্ব আসলে কতটাই বা ক্ষুদ্র!

পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব কত বড়?

বিজ্ঞানে একটা কথা খুব ব্যবহার হয়—‘পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব’ বা Observable Universe। এর মানে হলো, আমরা যা প্রযুক্তি দিয়ে দেখতে বা পরিমাপ করতে পারি। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, পুরোটা দেখতে সমস্যা কোথায়?

আসলে আলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় নেয়। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার! কিন্তু তবুও, দূর-দূরান্তের গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছাতে এত হাজার কোটি বছর সময় নেয় যে, আমরা শুধু ততটুকুই দেখতে পাই যতদূর থেকে আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছানোর সময় পেয়েছে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, আমরা যতদূর পর্যন্ত দেখতে পারি, সেই পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব কত বড় জানেন? এর ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ!

আলোকবর্ষ মানে কী সহজ ভাষায়? আলো এক বছরে যতটুকু দূরত্ব পার হয়, সেটাকে এক আলোকবর্ষ বলে। এখন হিসাবটা একটু মাথায় ঘুরিয়ে দেখুন, আলো এক সেকেন্ডেই ৩ লাখ কিলোমিটার যায়, আর সে যদি ৯৩ বিলিয়ন বছর ধরে চলতে থাকে—সেই দূরত্বটা কত বড় হতে পারে! এই সাধারণ সংখ্যাটা চিন্তা করলেও গায়ে কাঁটা দেয়।

দেখার বাইরের মহাবিশ্ব কত বড় হতে পারে?

আচ্ছা, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সীমানার বাইরে তাহলে কী আছে? উত্তর হলো—সেখানেও কিন্তু গ্যালাক্সি, নক্ষত্র আর ফাঁকা জায়গা ছড়িয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, দেখার বাইরের মহাবিশ্ব কত বড় তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা হয়তো নেই।

অনেকের মতে এটি অসীম। অসীম জিনিসটা কল্পনা করাটা বেশ কঠিন। আপনি যতদূর পর্যন্ত ভাবতে পারেন, তারচেয়েও বেশি দূর পর্যন্ত যদি নক্ষত্র আর শূন্যতা ছড়ানো থাকে—সেটাই হলো অসীম। আবার কেউ কেউ বলেন, মহাবিশ্ব হয়তো একটা গোলকের মতো, কিন্তু সেটা এতই বিশাল যে আমরা তার বাঁকটাই বুঝতে পারি না।

আজকাল আবার ‘মাল্টিভার্স’ বা বহু-মহাবিশ্বের একটা থিওরি নিয়ে খুব চর্চা হয়। যদি সত্যিই মাল্টিভার্স থেকে থাকে, তবে আমাদের এই একটাই মহাবিশ্ব কত বড়—সেই চিন্তাই যেখানে থমকে যায়, সেখানে একের অধিক মহাবিশ্বের অস্তিত্ব চিন্তা করাটা একধরনের পাগলামিই বটে!

রাতের আকাশের দিকে তাকালে যা মনে হয়

একদিন রাতে হঠাৎ যখন শহরের কোলাহল থামে আর আকাশ পরিষ্কার থাকে, তখন আকাশের দিকে একটু সময় নিয়ে তাকাবেন। আপনার মনেও হয়তো ঠিক একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাবে যে, এই মহাবিশ্ব কত বড় আর এর বিশালতার মাঝে আমরা আসলে কতটা ছোট!

তবে এই ছোট হওয়ার মধ্যে কিন্তু এক ধরণের সৌন্দর্য আছে। এত বিশাল, এত অনন্ত একটা মহাবিশ্বের ভেতরে যে আমরা বেঁচে আছি, চিন্তা করতে পারছি, এই জটিল সমীকরণগুলো নিয়ে গল্প করতে পারছি—এটাও কম অলৌকিক কিছু নয়।

বিজ্ঞান হয়তো দিন দিন আরও নতুন নতুন টেলিস্কোপ বানাবে, হয়তো আমরা আরও দূরের সীমানা দেখতে পাব। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, এই মহাবিশ্ব কত বড় তার চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আমরা কখনো পুরোটা জানতেও পারব না। আর এই না-জানাটাই তো মহাকাশের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, তাই না?